মোঃ মনজুর হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিগত সরকার বিজাতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এদেশের ৯২% ভাগ মুসলমানের প্রতিষ্ঠিত ঈমান, আকিদা, আমল, কৃষ্টি কালচারের তোয়াক্কা না করে, পীর মাশায়েখ, আলেম-ওলামাদের প্রতিবাদে কর্ণপাত না করে জাতির উপর নাস্তিক্যবাদ, বানরতত্ত্ব, বিজাতীয় অপসংস্কৃতি, হিন্দুত্ববাদের বস্তাপচা মতবাদ চাপিয়ে দিয়েছিল। অলি আউলিয়ার এদেশে একগুয়োমির চরম পর্যায়ে পৌঁছে দেশের কোটি কোটি টাকা অপচয় করেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক ধর্মহীন, অশ্লীলতা, সমকামিতা, হিন্দুয়ানি মানসিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ করেছিল। আল্লাহ তা'আলা লাখ লাখ ওলী-আউলিয়া ও আলেম সমাজের চোখের পানির জোয়ারে তাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে দেশছাড়া করেছেন। বর্তমান মুক্ত পরিবেশে পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করা হবে এটা যে চলমান প্রক্রিয়া ও বাস্তবতা এতে কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পরিমার্জনের দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছে তাদের তালিকা ও দায়িত্ব বন্টন দেখে নতুন করে এদেশের আহলুস সুন্নাতের আকিদা, আদব কায়দা, হানাফী মাযহাবের অনুসারীদের প্রতিষ্ঠিত ফিকহ্ ও আখলাক বাদ দিয়ে ভিনদেশি প্রত্যাখ্যাত অগ্রহণযোগ্য দর্শন, মতবাদ ঢুকিয়ে দেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একটি সংগঠন ও মতাদর্শের লোককে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দেশের বড় বড় মাদরাসার বিজ্ঞ অভিজ্ঞ আলেম গবেষকদের স্থান না দিয়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির চিহ্নিত মতবাদের ধারক-বাহক, কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকদেরকে পরিমার্জনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত, তরিকতপন্থী, হানাফী মাযহাবের অনুসারীদের আকিদা বিশ্বাস, আমল, আদব যদি পাঠ্যবই থেকে বাদ দিয়ে নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হয় তা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান মেনে নেবে না। ভবিষ্যতে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, এনসিটিবি, ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এর জবাব দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ মাদরাসার দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত আকাইদ ও ফিকহ্ বইগুলো দেশের শীর্ষ স্থানীয় আলেম উলামার মাধ্যমে রচনা সম্পাদন করার পর ৪০ এর অধিক দেশবরেণ্য আলেমদের সমন্বয়ে পরিমার্জন করে পাঠ্য হিসেবে পাঠদান করানো হচ্ছে। এ সকল পাঠ্য বই দেশের সবস্তরের আলেম-ওলামা গ্রহণ করে নিয়েছে। কিন্তু সংখ্যায় ব্যক্তি যারা সর্বকিছুতে শিরক, বিদ'আত, কুফর খুঁজে পান, মাযহাবের কথা বললে নাক সিটকান, তরীক্বা-হাকীকতকে ঘৃণা করেন শিরক শিরক বলে ফতোয়া দিয়ে বেড়ান পান, তারাই কিছু বিষয় দিয়ে আছে মাদরাসা সিলেবাস প্রণয়ন, গত কয়েকদিন আগে একটি সেমিনারে একজন বক্তা বলেই বসলেন মাদরাসার দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত আকাইদ ফিকহ্ বইগুলোতে বিদ'আত ও শিরক ভরা, এগুলো ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। আরেকজন বক্তা বললেন, আল্লাহ কোথায় আছেন এখনো মাদরাসার শিক্ষার্থীরা জানে না। আল্লাহ তা'আলাকে স্থানের সাথে সম্পৃক্ত করা মোজাসসেমা কুফুরী আকিদা তিনি শিক্ষার্থীদের শিখাতে চান।
এখন প্রশ্ন হল- কোনোটী বিদ'আত আর কোনোটী শিরক তা আইসিবিএ আকাইদ ও আইআরআইতে মুজতাহিদগণ নির্ধারণ করে গেছেন, যার ওপর প্রায় ৪৭ বছর উস্তাদ প্রশিক্ষিতা। নতুন মতবাদের ধারক-বাহকগণ বিদ'আত ও শিরকের মনগড়া সংজ্ঞা বানিয়ে সকল ক্ষেত্রে বিদ'আতের ফতোয়া দিয়ে গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত করতে তৎপর। তাই পরিমার্জন করতে হলে মাদরাসায় দীর্ঘদিন পড়ান, ফিকহ্ ও মুহাদ্দিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তাদের দ্বারা পরিমার্জন করা না হলে বিপদের আশঙ্কা থেকেই যাবে। আকাইদ-ফিকহ্ফের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ের পরিমার্জনের যারা দায়িত্ব পেয়েছে তারা হলেন-
১। ডক্টর আ.ন.ম রশিদ আহমদ, অধ্যাপক বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়- বিষয় বিশেষজ্ঞ ও সমন্বয়ক, আকাইদ ও ফিকহ। (যিনি সউদী মুবাল্লিগ) ২। প্রফেসর শাহজাহান, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ এন সি টি বি। ৩। মো. মিজানুর রহমান, প্রিন্সিপাল তামিরুল মিল্লাত মহিলা কামিল মাদরাসা, মাতুয়াইল, ঢাকা- বিষয় বিশেষজ্ঞ। ৪। ডক্টর লুৎফর রহমান, ভাইস প্রিন্সিপাল, উত্তর বাড্ডা কামিল মাদরাসা ঢাকা- বিষয় বিশেষজ্ঞ। ৫। মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, ফকিহ, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা- বিশেষজ্ঞ বিষয়। ৬। মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, মুহাদ্দিস, নয়াটলা এ ইউ এন মডেল কামিল মাদরাসা- বিষয় বিশেষজ্ঞ। ৭। ড. মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম রফিক, প্রিন্সিপাল মোহাম্মদাবাদ ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা, মিরপুর- ঢাকা- বিষয় বিশেষজ্ঞ এবং ৮। মুছফিরাতুল জান্নাত, সহকারী মৌলভী তামিরুল মিল্লাত মহিলা কামিল মাদরাসা, মাতুয়াইল, ঢাকা-বিষয় বিশেষজ্ঞ।
এ প্যানেলে একই মাদরাসা থেকে তিনজন বিশেষজ্ঞ অথচ দেশের প্রতিষ্ঠিত সেরা প্রতিষ্ঠান ছারছিনা, দারুন নাজাত, জামেয়া আহমদিয়া, শাহজালাল ইয়াকুবিয়াসহ বড় বড় মাদরাসার ফকিহগণ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরির্মাজনে স্থান পায়নি। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এ প্যানেল নির্বাচন করেছে।
এখন প্রশ্ন যাদের মাথায় সালাফিজম, লা- মাজহাবি মতবাদ কাজ করছে তাদের সমগ্র দেশের আকইদ-ফিকহ ও আখলাকের কী পরিমার্জন করবেন? যারা পীর মুরিদী তাসাউফের জ্ঞান চর্চা ও মোরশেদে কামিলের কাছে বাইয়াত হওয়াকে শিরক মনে করে, কদমবুচিকে বেদআত মনে করে, প্রিয় নবীজির প্রতি সালাতু সালামকে বেদআত মনে করে, নামাজের পর সম্মিলিত মুনাজাতকে বিদ'আত মনে করে, ওসিলাকে শিরক মনে করে, আল্লাহ শরীর নিয়ে আরশে বসে আছেন এই আকিদা পোষণ করে। মুরুব্বীদের সম্মানে দাঁড়ানোকে শিরক বলে, সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করে, আহলে বাইতের প্রতি মুহাব্বতকে বক্র চোখে দেখে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের মত মানুষ মনে করে, তিনি মরে মাটি হয়ে গেছেন এই আকিদা পোষণ করে, তার কোন ক্ষমতা নেই এই আকিদা প্রচার করে, নবী-রাসূলগণকে মাসুম নিষ্পাপ মনে করে না, জানাজা নামাজের পর দোয়া করাকে বিদ'আত মনে করে, কবর জিয়ারতকে শিরক মনে করে, ঈসালে সওয়াবকে বিদ'আত মনে করে, প্রিয় নবীজির শাফা'আতকে অস্বীকার করে, হজ সফরে মদিনা যাওয়া এবং রওজা জিয়ারতের প্রয়োজন নেই মনে করে, ইন্তেকালের পর নবী অলিগণের পক্ষ থেকে ফয়েজ উপকার লাভ করাকে শিরক মনে করে।
এ ধরনের আকিদা আমলের বহু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এক কথায় প্রায় ১৫০০ বছর থেকে চলে আসা উম্মতের আকিদা, আমল ও আখলাকসমূহকে নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ও মতবাদের গ-ি তে ফেলে সকল ক্ষেত্রে ফ্যাসাদ ও অনৈক্য সৃষ্টি করা কোনো অবস্থায় কাম্য নয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে দলীলভিত্তিক সহীহ আকিদা, আমল ও আখলাক সম্পর্কে জ্ঞান দিতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আকিদা ও আমলগত বিভ্রান্তির শিকার হবে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও এনসিটিবির উদ্যোগে শব্দ, বাক্যের ভুল সংশোধন করে মানসম্মত করাই যুক্তিযুক্ত। মূল টেক্সটে হাত দেয়া আদৌ ঠিক হবে কিনা তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। দেশের পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা ফকীহগণের দায়িত্ব বিষয়টি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।