হযরত মাওলানা মুফতি ক্বারী মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন আলম গাজী,
ইসলামিক গবেষক ও কলামিস্টঃ-
ইসলামে দান-সদকার গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে মানবিকতা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম হলো দান-সদকা। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সদকার বিভিন্ন ফজিলত ও উপকারিতার কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসের আলোকে দান-সদকার উল্লেখযোগ্য ১৯টি উপকারিতা তুলে ধরা হলো—
১. বিপদাপদ দূর হয়
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘সদকা বিপদ দূর করে।’
—শু‘আবুল ঈমান; সহীহুল জামে, হাদিস ৫৭৭০।
২. কবরের আজাব থেকে রক্ষা
সদকা কবরের আজাব থেকে রক্ষার অন্যতম মাধ্যম।
—তাবরানী, আল-মুজামুল কাবীর, হাদিস ১৬৫০৬; সহীহুল জামে, হাদিস ৩৫৬৬।
৩. অসুস্থতা ও গুনাহ থেকে মুক্তির মাধ্যম
হাদিসে এসেছে, সদকা অসুস্থতা দূর করে এবং গুনাহ মোচনের মাধ্যম হয়।
—সহীহুল জামে, হাদিস ৩৩৫৮।
৪. আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘সদকা আল্লাহর ক্রোধ নিভিয়ে দেয়।’
—সহীহুল জামে, হাদিস ৩৭৬৬।
৫. মন্দ পরিণতি থেকে রক্ষা
সদকার মাধ্যমে অকল্যাণকর পরিণতি থেকে রক্ষার কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
—সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদিস ১৯০৭।
৬. কিয়ামতের দিন ছায়া লাভ
কিয়ামতের কঠিন দিনে সদকা মানুষের জন্য ছায়ার কারণ হবে। হাদিসে এসেছে, মানুষ তার সদকার ছায়াতলে অবস্থান করবে।
—সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস ২৪৩১।
৭. ফেরেশতাদের দোয়া পাওয়া যায়
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন দানকারী ব্যক্তির জন্য উত্তম প্রতিদানের দোয়া করেন এবং অপরজন কৃপণের ধ্বংস কামনা করেন।
—সহীহ বুখারি, হাদিস ১৪৪২।
৮. গুনাহ মোচনের মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘সদকা গুনাহ মুছে দেয়, যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়।’
—তিরমিজি, হাদিস ২৬১৬; সহীহুল জামে, হাদিস ৫১৩৬।
৯. জান্নাত লাভের মাধ্যম
দান-সদকা জান্নাত লাভের অন্যতম আমল। এ বিষয়ে সহীহ হাদিসে সদকার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
—সহীহ বুখারি, হাদিস ১৮৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১০২৭।
১০. সম্পদে ঘাটতি আসে না
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’
—সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮।
১১. কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা
সদকা কিয়ামতের কঠিন ও ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষার অন্যতম আমল।
—সহীহুল জামে, হাদিস ১৪২৫।
১২. হিসাব সহজ হওয়ার মাধ্যম
গোপনে দান করা আল্লাহর অসন্তুষ্টি দূর করার এবং আখিরাতের হিসাব সহজ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
—তাবরানী, আল-মুজামুল কাবীর, হাদিস ৮০১১।
১৩. আয়ু বৃদ্ধির কারণ
সদকার মাধ্যমে আয়ু বৃদ্ধির কথা হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়।
—সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদিস ২৫৪; সহীহুল জামে, হাদিস ৫০০৪।
১৪. সম্পদে বরকত আসে
সদকা সম্পদে বরকত আনে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের দরজা খুলে দেয়।
—সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮।
১৫. গোপন দানের বিশেষ মর্যাদা
কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভকারী সৌভাগ্যবানদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যিনি এমনভাবে গোপনে দান করেন যে তাঁর বাম হাত জানতে পারে না ডান হাত কী দান করেছে।
—সহীহ বুখারি, হাদিস ৬৬০; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১০৩১।
১৬. আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল
ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা আল্লাহর কাছে প্রিয় আমলগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
—তাবরানী, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস ৬১৯২।
১৭. ঈমানের সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার মাধ্যম
অন্যকে খাবার খাওয়ানো ও মানুষের মধ্যে সালামের প্রচলন ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ঈমানের সৌন্দর্য প্রকাশ করে।
—আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ১০৯৬।
১৮. মানুষের প্রয়োজন পূরণ করলে আল্লাহ সাহায্য করেন
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের একটি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি বিপদ দূর করবেন।’
—সহীহ বুখারি, হাদিস ২৪৪২; সহীহ মুসলিম, হাদিস ৬৭৪৩।
১৯. দোয়া ও কল্যাণের মাধ্যম
সদকা বিপদ থেকে মুক্তি ও কল্যাণ লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে।
—সহীহুল জামে, হাদিস ৩৩৫৮।
সদকা হোক মানবিকতার অঙ্গীকার
দান-সদকা শুধু অর্থ প্রদান নয়; বরং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, ঋণগ্রস্তকে সহযোগিতা করা এবং মানুষের কল্যাণে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসাও সদকার অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত দান করা এবং তা লোকদেখানো থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।