দৈনিক সংবাদ উন্মোচন, নিউজ ডেস্কঃ
উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে সুপারির মৌসুম ঘিরে জমে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে চলছে সুপারি কেনাবেচার ধুম। কৃষকের বাগান থেকে সুপারি সংগ্রহ করে বাজারজাত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা। এদিকে গাছ থেকে সুপারি পেড়ে কোনো কোনো শ্রমিক প্রতিদিন আয় করছেন আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। সব মিলিয়ে সুপারিকে কেন্দ্র করে জেলার কৃষি ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সৃষ্টি হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুরে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদিত সুপারির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৭১০ কোটি টাকা। জেলার রায়পুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সুপারি উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া সদর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলাতেও সুপারির চাষ রয়েছে।
শতাধিক হাটবাজারে সুপারির বেচাকেনা
সুপারির মৌসুমে জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি বেড়েছে। উত্তর তেহমনী, হায়দাগঞ্জ, খাসেরহাট, মোল্লারহাট, মীরগঞ্জ, দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া, জকসিন, রামগঞ্জ শহর, সোনাপুর, কাঞ্চনপুর ও করপাড়াসহ বিভিন্ন বাজারে চলছে সুপারি কেনাবেচা।
স্থানীয় কৃষকেরা বাগান থেকে সুপারি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করছেন। ছোট ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে সুপারি কিনে বড় বাজারে সরবরাহ করছেন। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারেরা এসব বাজার থেকে সুপারি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে মৌসুমি বাণিজ্যের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহন ও শ্রমবাজারেও কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে।
সুপারি পেড়ে দৈনিক আয় আড়াই হাজার টাকা
সুপারি সংগ্রহের মৌসুমে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের। গাছ বেয়ে সুপারি পাড়তে দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদাও বেড়েছে।
রায়পুর উপজেলার কেরোয়া এলাকার শ্রমিক রুবেল হোসেন প্রায় ২০ বছর ধরে সুপারি পাড়ার কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে তিনি ১০ টাকা পান। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠে সুপারি সংগ্রহ করতে পারলে তাঁর আয় দাঁড়ায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।
শুধু সুপারি পাড়াই নয়, সংগ্রহ করা সুপারি বাছাই, পরিবহন, ভেজানো ও শুকানোর কাজেও যুক্ত রয়েছেন অনেকে। ফলে মৌসুমজুড়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষেরও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সংরক্ষণেও রয়েছে লাভের সম্ভাবনা
লক্ষ্মীপুরে কাঁচা, ভেজানো ও শুকনা—বিভিন্ন ধরনের সুপারি কেনাবেচা হয়। উৎপাদিত সুপারির একটি বড় অংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। অন্য অংশ কাঁচা অবস্থায় অথবা রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, সুপারি সংগ্রহের পর সংরক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে বিক্রি করতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে ভেজানো ও শুকনা সুপারির বাজারে চাহিদা থাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এ খাতে বিনিয়োগ করছেন।
দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস সুপারি চাষ
লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য উপযোগী। একবার সুপারিগাছ রোপণ করলে দীর্ঘ সময় ধরে ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে জেলার অনেক কৃষকের কাছে সুপারি চাষ দীর্ঘমেয়াদি আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, সুপারির উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিক পদ্ধতি চালু করা গেলে কৃষকেরা আরও লাভবান হতে পারবেন। পাশাপাশি সুপারি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো গেলে এ খাতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, লক্ষ্মীপুরের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনে সুপারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজারকে কেন্দ্র করে কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে, তা জেলার স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে তুলছে।