হযরত মাওলানা মুফতি ক্বারী মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন আলম গাজী,
ইসলামিক গবেষক ও কলামিস্ট :-
কবর জিয়ারত ইসলামী সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কবরস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের প্রতি রহমত কামনা করা এবং নিজের পরিণতির কথা স্মরণ করা—মুমিনের অন্তরকে আখিরাতমুখী করে তোলে।
কবর জিয়ারতের মাধ্যমে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝাতে প্রাচীন ইসলামী বর্ণনায় একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা পাওয়া যায়।
বর্ণনায় এসেছে, জনৈক ব্যক্তি নিয়মিত কবরস্থানে যাতায়াত করতেন এবং জানাজার নামাজেও অংশ নিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় তিনি কবরস্থানের দরজায় দাঁড়িয়ে কবরবাসীদের উদ্দেশে দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ভয়-ভীতি দূর করুন, তোমাদের অসহায়ত্বের প্রতি দয়া করুন, তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করুন এবং তোমাদের নেক আমল কবুল করুন।’
এ ছাড়া তিনি আর কোনো কথা বলতেন না।
একদিন তিনি পরিবারের কাছে ফিরে যান এবং সেদিন কবরস্থানে যেতে পারেননি। ফলে প্রতিদিনের মতো কবরবাসীদের জন্য তাঁর দোয়াও করা হয়নি। ওই রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর সামনে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা বলল, ‘আমরা কবরবাসী।’
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের আমার কাছে কী প্রয়োজন?’
তারা বলল, ‘তুমি তোমার দোয়ার মাধ্যমে আমাদের একটি উপহারে অভ্যস্ত করে ফেলেছ। অথচ সেই উপহার না দিয়েই তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে এসেছ।’
তিনি জানতে চাইলেন, ‘সেটি কী?’
তারা উত্তর দিল, ‘তুমি যে দোয়াগুলো প্রতিদিন আমাদের জন্য করতে, সেটিই।’
ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এরপর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, আর কখনো কবরবাসীদের জন্য দোয়া করা থেকে বিরত থাকবেন না। বর্ণনাকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তিনি নিয়মিত কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতে থাকেন এবং আর কখনো তা পরিত্যাগ করেননি।
ইমাম ইবন কাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ (রহ.) তাঁর ‘আর-রুহ’ গ্রন্থে এ ঘটনার সূত্র উল্লেখ করেছেন। সেখানে আবু বকর আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন উবাই ইবন আবিদ দুনিয়া (রহ.)-এর ‘কিতাবুল কুবুর’-এর ‘মারিফাতুল মাওতা বি জিয়ারাতিল আহইয়া’ অধ্যায়ের একটি বর্ণনার কথা উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থে বর্ণনাটি বাশার ইবন মানসুর (রহ.) থেকে বর্ণিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বর্ণনা থেকে কবর জিয়ারতের পাশাপাশি মৃতদের জন্য দোয়া, রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনার প্রতি উৎসাহের বিষয়টি ফুটে ওঠে। কবরস্থানে গেলে মানুষ নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এবং জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃতদের জন্য দোয়া করার মাধ্যমে আখিরাতের প্রতি সচেতনতা আরও গভীর হয়।
কবর জিয়ারত তাই শুধু অতীতের স্মৃতি মনে করার বিষয় নয়; বরং এটি মানুষকে নিজের পরিণতি, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং আখিরাতের জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের হৃদয়কেও পরিশুদ্ধ ও আখিরাতমুখী করার সুযোগ লাভ করেন।