মোঃ মনজুর হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ-
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জামিরতলী দারুস সুন্নাহ ইসলামিয়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার আরবি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক ও আবদুল্লাহ মিয়াজি জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মোঃ আবদুল ওদুদ পাটওয়ারী বলেছেন, তাকওয়া, ঈমান ও নেক আমলই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতার মূল চাবিকাঠি। দুনিয়াবি পরিচয়, সম্পদ, মর্যাদা কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়; বরং আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও সৎকর্ম।
তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)।
মাওলানা আবদুল ওদুদ পাটওয়ারী বলেন, তাকওয়া শুধু আল্লাহকে ভয় করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া, তাঁর আদেশ পালন করা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার নামই তাকওয়া। একজন প্রকৃত মুমিন গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করে চলেন এবং নিজের কথা, কাজ, আচার-আচরণ ও উপার্জনকে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালনা করেন।
তিনি আরও বলেন, নেক আমল মানুষের ঈমানকে সুদৃঢ় করে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। নিয়মিত নামাজ আদায়, রোজা পালন, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দান-সদকা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পিতা-মাতার খেদমত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ—সবই নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত। তবে এসব আমলের পাশাপাশি নিয়ত বিশুদ্ধ রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ মানুষের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি মানুষের অন্তর ও আমলের দিকে লক্ষ্য করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)।
তিনি বলেন, এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, বাহ্যিক চাকচিক্য কিংবা ধন-সম্পদ আল্লাহর কাছে মর্যাদার চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। মানুষের অন্তরের পবিত্রতা, নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং আমলের মানই প্রকৃত গুরুত্ব বহন করে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের অন্তরকে হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ, লোকদেখানো ইবাদত ও আত্মপ্রশংসা থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা।
বর্তমান সময়ে মানুষ দুনিয়াবি সফলতা অর্জনের প্রতিযোগিতায় ছুটতে গিয়ে অনেক সময় আখিরাতের সফলতার কথা ভুলে যায় উল্লেখ করে মাওলানা আবদুল ওদুদ পাটওয়ারী বলেন, প্রকৃত সফলতা হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখিরাতে নাজাত লাভ করা। দুনিয়ায় সম্পদ ও সম্মান অর্জন করা বৈধ; তবে তা যেন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত ও নৈতিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
তিনি আরও বলেন, একজন মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত। তাকওয়াবান মানুষ অন্যের অধিকার নষ্ট করেন না, প্রতারণা করেন না, অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেন না এবং কারও প্রতি জুলুম করেন না। বরং তিনি ন্যায়বিচার, সততা, আমানতদারি ও মানবিকতার আদর্শ ধারণ করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে নিজের বক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, “তাকওয়া এখানে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)। একই হাদিসে একজন মুসলমানের প্রতি জুলুম, অবজ্ঞা ও অপমান না করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মাওলানা আবদুল ওদুদ পাটওয়ারী বলেন, শুধু বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করলেই একজন মানুষ প্রকৃত মুমিন হতে পারেন না; বরং ঈমানের প্রভাব তাঁর চরিত্র ও কর্মে প্রকাশ পেতে হবে। একজন সত্যিকারের মুমিনের কথায় সত্য, কাজে সততা, আচরণে বিনয় এবং অন্তরে আল্লাহভীতি থাকা অপরিহার্য।
তিনি মুসলমানদের নিয়মিত নামাজ আদায়, কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ, হালাল উপার্জন, নেক আমল বৃদ্ধি, গুনাহ থেকে তওবা এবং মানুষের অধিকার যথাযথভাবে আদায়ের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে পরিচালিত করাই মুমিনের সবচেয়ে বড় সফলতা।
তিনি বলেন, মানুষ যদি তাকওয়াকে জীবনের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী নেক আমল করে, তাহলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ অর্জনের পাশাপাশি আখিরাতে মহান আল্লাহর রহমত ও নাজাত লাভের আশাও করা যায়।
পরিশেষে তিনি বলেন, মুমিনের প্রকৃত পরিচয় শুধু কথায় নয়; বরং তাকওয়া, বিশুদ্ধ নিয়ত, উত্তম চরিত্র ও নেক আমলের মাধ্যমেই তার ঈমানের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে।