এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ছিল গড়ে ৯ টাকা ১১ পয়সা। অর্থাৎ গড়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫২ পয়সা বা ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং সঞ্চালন বা হুইলিং চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। এর আগে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) ও ছয়টি বিতরণ কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
গণশুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের মতামত গ্রহণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির সক্ষমতা বিবেচনায় মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। তবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাস পর পর বিদ্যুতের দাম সমন্বয় ও গ্রাহক স্লাব পরিবর্তনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।
ঘোষণা অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছে। শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মূল্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে ৬ টাকা ১৮ পয়সা এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়েছে।
২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহারে প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ১০ পয়সা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটে ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে উচ্চ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
আবাসিক খাতের বাইরে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক ও সেবামূলক খাতেও মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। কৃষি সেচে ইউনিটপ্রতি মূল্য ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা শূন্য ৪ পয়সা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে ৯ টাকা শূন্য ৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাস্তার বাতি ও পানি সরবরাহ পাম্পে বিদ্যুতের মূল্য ৯ টাকা ৭১ পয়সা থেকে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে ইউনিটপ্রতি মূল্য (ফ্ল্যাট) ১০ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং বাণিজ্যিক ও অফিস শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য মূল্য (ফ্ল্যাট) ১৩ টাকা শূন্য ১ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের জন্য বিদ্যুতের ১১ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খুচরা মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে পাইকারি ও সঞ্চালন ব্যয়ের বৃদ্ধি উল্লেখ করেছে কমিশন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিইআরসি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ডলার বিনিময় হার বৃদ্ধি, আমদানি করা জ্বালানির উচ্চমূল্য, বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ব্যয় এবং সক্ষমতা চার্জের চাপের কারণে পিডিবির রাজস্ব ঘাটতি ক্রমাগত বাড়ছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন পাইকারি মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পরও পিডিবির সব ঘাটতি পূরণ হবে না। অবশিষ্ট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
অন্যদিকে পিজিসিবির সঞ্চালন ব্যয় বিবেচনায় বিদ্যুতের হুইলিং চার্জ বাড়ানো হয়েছে। গড় সঞ্চালন চার্জ দশমিক ৩১৩৫ পয়সা থেকে দশমিক ৩৮৮৬ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ ইউনিটপ্রতি সঞ্চালন চার্জ দশমিক ০৭৫১ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে।
যদিও কমিশন বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে শিল্প ও বড় গ্রাহকদের জন্য ডিমান্ড চার্জে কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে। কারণ মাত্র ৩ থেকে ৬ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানি আবেদন জমা দেয়, ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং তার অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন মূল্যহার ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে অনেকেই প্রক্রিয়াটিকে অস্বাভাবিক দ্রুত বলে মন্তব্য করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দ্রুত করার কোনো চাপ ছিল না। বাজেট প্রক্রিয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর কী প্রভাব পড়বে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানুষের ব্যয় বাড়বে, এটা স্বাভাবিক। তবে এ বিষয়ে আলাদা কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা করার সুযোগ আছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে শুধু আবাসিক গ্রাহকই নয়, শিল্প, কৃষি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন খাতেও ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পণ্যের উৎপাদন খরচ ও বাজারদরে পড়তে পারে। অন্যদিকে সরকার ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমাতে পারলেও নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পরও বিদ্যুৎ খাতকে টিকিয়ে রাখতে বছরে কয়েক দশক হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক টেকসইতা, ভর্তুকি নির্ভরতা এবং মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিল্প-কারখানা, কৃষি, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা খাতসহ পুরো অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। আর উৎপাদন ব্যয়ের এই অতিরিক্ত চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়, যা মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য বিল সহায়তা বা ভর্তুকি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে ভর্তুকি কমানোর যুক্তিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা সমর্থনযোগ্য নয়। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও দেশে এ খাতে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্যহার ছিল ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। তবে নতুন করে মূল্যহার ঘোষণার সময় তা ধরা হয়েছে ৯ টাকা ১১ পয়সা। যদিও এর কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেনি বিইআরসি।
তবে এ বিষয়ে পিডিবির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। তারা জানান, আগে বিইআরসি শুধুমাত্র এনার্জি রেটের গড় হিসাব করে গ্রাহক পর্যায়ে গড় মূল্যহার নির্ধারণ করত। তবে এবার এনার্জি রেটের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ যোগ করে বিতরণ সংস্থাগুলোর আয়ের ওপর গড় মূল্যহার হিসাব করা হয়েছে। এজন্য আগের গড় মূল্যহার ১৬ পয়সা বেড়ে গেছে।







