যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ১ হাজার পিস সরকারি সিরিঞ্জ ও ৪০০ পিস মেডিকেল প্লাস্টারসহ দুই আয়াকে (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) আটক করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে হাসপাতালে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ৩ নম্বর গেটের সামনে থেকে মালামালসহ তাঁদের আটক করেন।
আটককৃতরা হলেন—যশোর সদর উপজেলার চানপাড়া গ্রামের মাসুমের স্ত্রী নাদিরা খাতুন (৪০) ও বাহাদুরপুর গ্রামের শরিফুলের স্ত্রী জ্যোতি (৩০)। নাদিরা মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে এবং জ্যোতি মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ‘স্বেচ্ছাসেবী’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুপুর পৌনে ২টার দিকে নাদিরা ও জ্যোতি হাসপাতাল থেকে ১০ বক্স সরকারি সিরিঞ্জ ও ৪ বক্স প্লাস্টার বাইরে পাচার করছিলেন। এ সময় ৩ নম্বর গেটের সামনে কর্তব্যরত পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁদের তল্লাশি করে এই বিপুল পরিমাণ সরকারি মালামালসহ আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা স্বীকার করেছেন যে, সরকারি এসব চিকিৎসাসামগ্রী তাঁরা বাইরে চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবির বাপ্পি জানান, সরকারি সিরিঞ্জ ও প্লাস্টার পাচারের সময় দুই স্বেচ্ছাসেবী কর্মী হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করার পাশাপাশি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সরকারি মালামাল চুরির অভিযোগে আটক দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোর জেনারেল হাসপাতালে আগত রোগীদের জিম্মি করে অর্থবাণিজ্য এবং সরকারি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী লুটপাটে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কতিপয় চিকিৎসকের পরোক্ষ মদদে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বছরের পর বছর একই ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি তিন মাস পর পর বিভিন্ন ওয়ার্ডের ডিউটি রোস্টার পরিবর্তনের নিয়ম খাতা-কলমে বন্দি থাকলেও অদৃশ্য কারণে তা কার্যকর হয় না। অতীতে অনিয়ম করে ধরা পড়ার পরও কতিপয় চিকিৎসক এই কর্মচারীদের পক্ষে ‘ঢাল’ হয়ে দাঁড়ানোয় সাবেক কর্মকর্তারাও এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও স্থায়ী কর্মচারী জানান, একাধিক তত্ত্বাবধায়ক এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। অনিয়মের সত্যতা পেয়ে কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি করতে গেলে কতিপয় চিকিৎসক বেঁকে বসেন এবং দাবি করেন—এই কর্মচারীরা ‘এক্সপার্ট’ হয়ে গেছেন, এদের সরালে চিকিৎসকদের কাজে বেগ পেতে হবে। এই সুযোগে চিকিৎসকের স্বাক্ষরবিহীন ‘শার্ট স্লিপ’ ব্যবহার করে সরকারি ওষুধ ও মালামাল গায়েব করে এই চক্রটি।
হাসপাতালটির অতীত রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, ওষুধ ও মালামাল চুরির ঘটনা এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এর আগে মহিলা সার্জারি ওয়ার্ড থেকে ৩৯ পিস গ্যাসের ইনজেকশন (প্যানটিক্স) ও ৩৯ পিস অ্যান্টিবায়োটিক (সেফটিঅ্যাক্সন) চুরির অভিযোগে কহিনুর আক্তার ও তাঁর পুত্রবধূ পলি নামের দুই স্বেচ্ছাসেবীকে বরখাস্ত করেছিল কর্তৃপক্ষ। এর আগেও ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রোগীদের ড্রেসিং বাণিজ্যের অভিযোগে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান এই কহিনুরকে হাসপাতাল থেকে বের করে দিয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল, রোগীর প্রতিবার ড্রেসিংয়ের জন্য তিনি ১০০ টাকা করে নিতেন। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই একটি পক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করে তাঁরা আবারও হাসপাতালে বহাল হন।
এ ছাড়া চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি হাসপাতালের ওষুধ গোডাউনের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১ হাজার পিস সিরিঞ্জ উদ্ধার হলেও জড়িতরা অধরা থেকে যায়। তারও আগে জরুরি বিভাগ থেকে ৪ বস্তা চিকিৎসাসামগ্রী চুরির ঘটনায় খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মুনজুর মুরশিদ হাসপাতাল পরিদর্শন করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবী হৃদয়ের বাড়ি থেকে সেই ৪ বস্তা মালামাল উদ্ধার করা হলেও অভিযুক্ত ওসমান ও হৃদয়ের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একের পর এক চুরির ঘটনায় পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই হাসপাতালে অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, “সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে আমি সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান নিয়েছি। ইতিমধ্যেই স্বেচ্ছাসেবীদের অনৈতিক বাণিজ্য অনেকটাই কমে এসেছে। ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী লুটপাট এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত এই সিন্ডিকেট আমি যেকোনো মূল্যে ভেঙে দেব।”