মো. রিয়াজ উদ্দিন, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ-
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ এলাকার পশ্চিম চরচামিতা বায়তুন নূর জামে মসজিদের খতিব এবং জামিরতলী দারুসসুন্নাহ ইসলামিয়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মো. মাকছুদুর রহমান জুমার বয়ানে পবিত্র কুরআনের আলোকে প্রকৃত মুমিনের মর্যাদা ও গুণাবলী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ১১১ ও ১১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মর্যাদা এবং তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ১১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, তিনি মুমিনদের জীবন ও সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। এরপর ১১২ নম্বর আয়াতে প্রকৃত মুমিনের গুণাবলী ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন—
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ…
অর্থাৎ, “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, অতঃপর তারা হত্যা করে এবং নিহত হয়। এটি তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে আল্লাহর সত্য প্রতিশ্রুতি। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণকারী আর কে হতে পারে? সুতরাং তোমরা যে সওদা করেছ, সে সওদার জন্য আনন্দিত হও। এটাই মহাসাফল্য।”
পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন—
التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ ۗ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
অর্থাৎ, “তারা তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকুকারী, সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশদাতা, অসৎকাজের নিষেধকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার হেফাজতকারী। আর আপনি মুমিনদের সুসংবাদ দিন।”
আলোচনায় তিনি বলেন, এই দুই আয়াতে প্রকৃত মুমিনের দশটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো—
১. আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী— আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা। এ প্রসঙ্গে তিনি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে জিহাদের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
২. তাওবাকারী— ভুল হয়ে গেলে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। তিনি তিরমিযী ও ইবনে মাজাহর হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “প্রত্যেক আদম সন্তানই পাপী, আর উত্তম পাপী হলো সে, যে তাওবা করে।”
৩. ইবাদতকারী— মহান আল্লাহর ইবাদতেই জীবন উৎসর্গ করা। এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা আয-যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন।
৪. আল্লাহর প্রশংসাকারী— সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
৫. সিয়াম পালনকারী— ফরজ ও নফল উভয় ধরনের রোজা পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
৬. রুকুকারী— নিয়মিত সালাত আদায় করে রুকুর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ করা।
৭. সিজদাকারী— সিজদার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সামনে সর্বোচ্চ আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশ করা।
৮. সৎকাজের আদেশদাতা— নিজে সৎকাজ করা এবং অন্যদেরও সৎকাজে উৎসাহিত করা।
৯. অসৎকাজের নিষেধকারী— সমাজে অন্যায় ও পাপাচার প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকা।
১০. আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার হেফাজতকারী— আল্লাহর আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে মেনে চলা এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা।
বয়ানের শেষাংশে মাওলানা মো. মাকছুদুর রহমান বলেন, মুমিনের এই দশটি বৈশিষ্ট্য একজন মুসলমানের ঈমানি জীবনের মৌলিক ভিত্তি। কুরআনে পাশাপাশি দুটি আয়াতে এসব গুণাবলীর উল্লেখ তাদের গুরুত্বকেই সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তিনি আরও বলেন, কুরআন ও হাদিসে মুমিনের আরও বহু গুণাবলীর আলোচনা রয়েছে, যা অন্য সময়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।
সবশেষে তিনি মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করে বলেন, “আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রকৃত মুমিনের গুণাবলী অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।”